ইতিবৃত্ত
ভারতের নৃত্য কলার অন্যান্য ধারার মতো ভরতনাট্যম
নৃত্য পদ্ধতির মূল ভাবধারাও ধর্ম ভিত্তিক ও দেব নির্ভর। দেবতাকেন্দ্রিকতা থেকে
মানবকেন্দ্রিকতা এই পথ যদি অনুসরন করতে হয় তবে উত্তরনের পথ প্রদর্শক হিসাবে
ভরতনাট্যমকেই অনুসরন করতে হবে। শিব তাণ্ডব থেকে উৎপত্তি এই নৃত্যের। ভারতীয়
ইতিহাসের ধারা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও ছিন্নসুত্র হওয়ার দরুন ভারতের নৃত্য কলার ইতিহাস
জানাও প্রায় অসম্ভব। তবে ভরতনাট্যমের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের ইতিহাসের
গতিধারাকেই অনুসরন করতে হবে। জানতে হবে কোন পথের মাধ্যমে এই নৃত্যকলা ছড়িয়ে পড়েছে সারা
দেশে।
প্রাচীনতম
নাট্য শাস্ত্রকার ভরত মুনির রচনাকালের আগেও দেশে প্রচলিত ছিল বিভিন্ন শাস্ত্রীয়
নৃত্য পদ্ধতি যা মূলত এসেছিল প্রাচীন গ্রন্থ, স্থাপত্য ও পুরাণ অনুযায়ী।
হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় প্রাপ্ত নারী মূর্তি স্থাপত্য, ধ্বংসস্তুপ দেখে গবেষণার মাধ্যমে একথা প্রমানিত যে প্রাক-বৈদিক
যুগেরও আগে চর্চা ছিল নৃত্য শৈলীর। এছাড়া বহু সংগৃহীত গ্রন্থ, মূর্তি প্রভৃতি
বিক্ষিপ্ত উপাদানের গবেষণা করে তবেই ভরতনাট্যমের প্রকৃত ইতিহাস রচনা সম্ভব।
ভরতনাট্যমের
ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বড়ো উপাদান হল মন্দির ও দেবদাসী। এদের ভূমিকা এই নৃত্য কলায়
সর্বাধিক। অতি প্রাচীনকাল থেকে দেবমন্দিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেবতার প্রীতির জন্য
দেবদাসী-দের (দেবদাসী – দেবতাদের জন্য রক্ষিত দাসী, রাজার ভোগ বিলাসিনী নন)
নৃত্য-গীত প্রদর্শনের প্রথা ছিল।এই জন্য পূর্বে এই নৃত্য ‘দাসী-আটটম’ নামে পরিচিত ছিল। চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে সংকলিত পদ্মপুরাণ থেকে জানা
যায় স্বর্গে পূর্ণ কল্পলাভের উদ্দেশ্যে দেবতাকে সুন্দরী স্ত্রী উৎসর্গ করার বিধি।
ভবিস্য পুরাণে সূর্যের উপাসনায় নৃত্য-গীতি কুশলা স্ত্রী লোকদের উৎসর্গ করার বিধির
উল্লেখ পাওয়া যায়। শিব পুরাণে শিব মন্দির নির্মাণ ও সংরক্ষন প্রসঙ্গে অন্যান্য
বিধানের সাথে দেবসেবায় নিয়োজিত নৃত্য-গীত কুশলী সুন্দরী স্ত্রীলোক, দেব মনোরঞ্জনের
জন্য নিয়োজিত হতো।
তক্ষশীলার
ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত ঊর্ধ্বতাণ্ডব ভঙ্গীযুক্ত নট মূর্তি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও
চতুর্থ শতাব্দীর শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধ নৃত্য পদ্ধতির অস্তিত্ব প্রমান করে। প্রখ্যাত চোল
রাজা প্রথম রাজরাজ- এর রাজত্বকালে (৯৮৫-১০১৪ খ্রিঃ) তাঞ্জরের মন্দিরে চারশত
দেবদাসীর অবস্থিতির কথা জানা যায়। গজনির সুলতান মামুদ যখন ভারতের সোমনাথ মন্দির
আক্রমন করে তখন সেখানে প্রায় পাঁচ শত দেবদাসী ছিল বলে জানা যায়।
No comments:
Post a Comment