Tuesday, 29 November 2016

ভরতনাট্যম – পোশাক, অলঙ্কার, রূপসজ্জা


পোশাক, অলঙ্কার, রূপসজ্জা


পোশাকঃ উজ্জ্বল রঙের পোশাক একজন ভরতনাট্যম শিল্পীর বৈচিত্র্য বহন করে। পূর্বে এই উজ্জ্বল স্বর্ণ বর্ণীয় শাড়ি একজন শিল্পী কে তার যোগ্যতার বিচারে প্রাপ্ত করতে হতো। সোনার কাজ করা শাড়িতে থাকতো উজ্জ্বল বর্ণের পাড়। তবে বর্তমান যুগে এর প্রভাব অনেকখানি কমে গেছে। এখন উজ্জ্বল বর্ণের শাড়িই কেবল ব্যবহার করা হয়।

গয়নাঃ ভরতনাট্যম শিল্পীগণ কমপক্ষে ১০ রকম গয়না ব্যবহার করেন। ঝুমকো, কানপাশা, হার, বাজুবন্ধ, চুড়, রত্নহার, চন্দ্রকলা, কোমরবন্ধ প্রভৃতি। মাথার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় ৩ ধরনের অলঙ্কার। ব্রোচ জাতীয় অলঙ্কার ‘চন্দ্র’ ও ‘সূর্য’ ব্যবহার করা হ্য়।এবং প্রত্যেক পায়ে ব্যবহৃত হয় ৫০ টি ঘণ্টি যুক্ত ঝুমুর যা তালের সাথে ঝঙ্কারে নৃত্য অঙ্গনকে রমণীয় নেশায় ভরে তোলে।

রূপ সজ্জাঃ শিল্পীর মুখ অত্যন্ত সুক্ষ এবং উজ্বল রঙা সজ্জা হয়ে থাকে। গভীর করে পড়া হয় কাজল, ঘন কালো চোখের পাতা, উজ্জ্বল লিপস্টিক এবং কপালে লাল সিঁদুরের টিপ।

ভরতনাট্যম – ব্রিটিশ আমলের বাধা


ব্রিটিশ আমলের বাধা


অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্দিয়া কোম্পানির আগমন ও শাসন কালে ভারতবর্ষের অধিকাংশ নৃত্যকলাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। খ্রিস্টান মিশনারির আমলে ‘দেবদাসী’ রা পরিচিত হন ‘নাচিয়ে মহিলা’ হিসাবে, যা তাদের মান-সম্মানে সরাসরি আঘাত হানে। ফলে কিছু ব্রিটিশ সমাজসেবীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘Anti-Dance Movement’ ১৮৯২ সালে।


১৯১০ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্ট হিন্দু মন্দির গুলিতে দেবদাসী প্রথা এবং ভরতনাট্যম নৃত্যকলা বন্ধ করে দেয়। তবে বিংশ শতকের শুরুর দিকে শ্রী কৃষ্ণ আইয়ার এর নেতৃত্বে এই দৃশ্যে পরিবর্তন আস্তে শুরু করে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠার সাথে সাথে ফিরে আস্তে থাকে এই প্রাচীন নৃত্যশৈলী। শিক্ষিত সম্প্রদায় এই নৃত্য কলায় দার্শনিকতা ও ধার্মিক আঙ্গিক বিচার করে পুনরায় আরম্ভ করে এই নৃত্য চর্চা। ১৯৩০ সালের শুরুর দিকে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শুরু হয় এই প্রাচীন শিক্ষার প্রচলন। তবে তার স্থানান্তর হয় মাত্র। অর্থাৎ মন্দির থেকে এই নৃত্য অনুষ্ঠিত হতো শহরের থিয়েটারে। 

Monday, 28 November 2016

ভরতনাট্যম – বর্তমান অবস্থা, শ্রী কৃষ্ণ আয়ার ও রুক্মিণী দেবী

বর্তমান অবস্থা, শ্রী কৃষ্ণ আয়ার ও রুক্মিণী দেবী

নটনাদীবাদ্যরঞ্জনম ও শিলাপ্পদিকারম এই দুটি বই থেকে আমরা ভরতনাট্যম নৃত্যধারা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পেয়ে থাকি। অনেকে মনে করেন ভরতনাট্যম অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে মাদ্রাজ ও অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিখ্যাত কবি ও সঙ্গীত স্রষ্টা ঋষি ত্যাগরাজ এর তেলুগু ভাষায় রচিত অপূর্ব সঙ্গীতের মাধ্যমে ভরতনাট্যমের নাট্যধর্মী নৃত্য রূপায়িত হতে থাকে। তাঞ্জরের মহারাজা স্বোয়াদি থিরুমল সংস্কৃত ভাষায় বিষ্ণু বন্দনা সঙ্গীত রচনা করেন।

চিত্রঃ রুক্মিণী দেবী আরুন্দেল 
তাঞ্জরের রাজ দরবারের চিন্নাইয়া, পুন্নাইয়া, শিবনন্দন ও ওয়ারিভেলু এই চার ভাই, মাদুরার শ্রী সুভারায়া আন্নাভি, কল্যাণী সুন্দরম পিল্লাই, পেরিয়াতাম্বি আন্নাভি, পুন্যস্বামি আন্নাভি প্রভৃতি আচার্য দের নাম এই নৃত্যকলায় চিরস্মরণীয়।


ভরতনাট্যমকে পুনরুজ্জীবন ও সমৃদ্ধ করার জন্য যারা আত্ম নিবেদন করেছেন তাদের মধ্যে শ্রী কৃষ্ণ আয়ার ও শ্রীমতী রুক্মিণী দেবী আরুন্দেল এর নাম প্রথমেই উল্লেখ্য। দক্ষিন ভারতে যখন নাচের বিরোধী জনমত সংগঠিত করা হচ্ছিল তখন শ্রী কৃষ্ণ আয়ার এর বিরোধিতা করেন। এবং সংবাদপত্রের সহযোগিতায় ভরতনাট্যম নৃত্যকলার পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু করেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় শ্রীমতী বালা সরস্বতী বেনারসে ‘নিখিল ভারত সঙ্গীত মহা সম্মেলনে’ ভরতনাট্যম নৃত্য প্রদর্শনের সুযোগ পান।


শ্রীমতী রুক্মিণী দেবীর নাম ভারতের নৃত্য কলার গবেষণা ও প্রসারের ইতিহাসে সর্বকালে বিশেষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করতে হবে।তিনি কেবল মাত্র একজন কুশলী শিল্পী হওয়ার প্রয়াসেই আবদ্ধ থাকেননি। তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতা ও বিধি নিষেধ তুচ্ছ করে নৃত্যকলাকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আত্ম নিয়োগ করেছেন। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কারমুক্ত বুদ্ধিগত ভাবে নৃত্যকলার চর্চা তিনিই প্রবর্তন করেন।  

ভরতনাট্যম – সঙ্গীত

সঙ্গীত

   ভরতনাট্যম নৃত্যকলার অন্যতম প্রধান অঙ্গ সঙ্গীত। সঙ্গীত অংশে একজন সুকণ্ঠ শিল্পীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আবহ সঙ্গীতে বীণা, তম্বুরা, বাঁশি, নফরি, সারাংগি, বুদবুদিকা, মৃদঙ্গম, করতাল, বেহালা, সুর শৃঙ্গার, নাগেশ্বরম ও মন্দিরা ব্যবহৃত হয়।

    সাধারনভাবে ভরতনাট্যম নৃত্যে রুবকম, জাম্বাই, এরাবম, তিরুপদ্দাই, আড়াতালাম, মিত্তিয়াম, এক্তালাম প্রভৃতি নয়টি তালের ব্যবহার হয়। তালের পাঁচটি মাত্রার নাম সাধুশ্রম (চার মাত্রা), তিশ্রম (তিন মাত্রা), মিশ্রম (সাত মাত্রা), কাণ্ডম (পাঁচ মাত্রা) ও সঙ্গিরন্ম (নয় মাত্রা)। তাল গুলি বিভিন্ন মাত্রা ও যতি সহযোগে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে।

    ভারতের সবকটি নৃত্যকলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল এই ভরতনাট্যম। মহৎ শিল্পের সবকটি গুণই এই নৃত্যে আছে। কাব্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও অভিনয় এই চারটির মিলমিশে তৈরি হয় চতুরঙ্গ। শিল্পী মানসের প্রকাশ-উন্মুক্ত রূপ ভাবনা ললিত ছন্দে ও ভাবাভিনয়ের উৎকর্ষে দর্শক মন হয়ে ওঠে সহৃদয়। কাব্য, সঙ্গীত, নৃত্যে ও ছন্দের বিশিষ্ট বিভঙ্গে লীলায়িত একটি অনন্য রূপ ভাবনা দর্শককে রসমার্গে উদ্বোধিত করে।

    এখানে শিল্পীর হস্ত মুদ্রায় স্বর্গের ফুল ফোটে, দেহ ভঙ্গির বিচিত্র সঙ্গীতে সিন্ধু তরঙ্গের হিল্লোল লীলায়িত হয়, গ্রীবা বিভঙ্গে গর্ব ও নিবেদন বিচিত্র রঙ্গে মূর্ত হয়, আঁখি পল্লবের উন্মোচন ও পাতনে প্রতিবিম্বিত হয় – প্রেম, প্রতীক্ষা ও সংশয়।   

Friday, 18 November 2016

ভরতনাট্যম – মুদ্রা

মুদ্রা

আস্যেনালম্বয়েদ গীতং হস্তেনাথং প্রদর্শয়েৎ ।
চক্ষুভাং দর্শয়েদ্ভাবং পাদাভ্যাঅং তালমাদিসেৎ ।।
যতো হস্তস্ততো দৃষ্টিষতো দৃষ্টিষতো মনঃ ।
যতো মনস্ততো ভাব যতো ভাবস্ততো রসঃ ।।

    
    অর্থাৎ, মুখের দ্বারা গান অবলম্বন করা উচিত, হস্তের দ্বারা গানের অর্থ প্রদর্শন, চক্ষু দ্বারা ভাব প্রদর্শন ও পদদ্বয়ে তাল রক্ষা করা উচিত। যেখানে হস্ত সেখানে দৃষ্টি, যেখানে দৃষ্টি সেখানেই মনের গতি, যেখানে মনের গতি সেখানেই ভাব, আর সেখানেই রসের উৎপত্তি।
    
    নৃত্যকলায় রস ও ভাব প্রকাশের জন্য প্রয়োজন হয় মুদ্রা। ‘মুদ্রং আনন্দং রাতি দাতি’ অর্থাৎ মুদ্রা বলতে বোঝায় যা আনন্দ দান করে। নৃত্যে আঙ্গিকাভিনয়ের জন্য বিভিন্ন হস্ত মুদ্রা বিভিন্ন ভাব ও রস পরিবেশন করে।
রসোৎপত্তি হলে তবেই নাচ স্বাদযুক্ত হয়। ফলত প্রতীকধর্মী মুদ্রাগুলি মানুষের আন্তঃভাব ও রসকে বাস্তবের জগতে প্রতিফলন ঘটায়। হস্ত অর্থাৎ হাতের দ্বারা সৃষ্ট মুদ্রার মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। দৃষ্টি আকর্ষিত হওয়ার ফলে মন আকৃষ্ট হয়। দৃষ্টি আকর্ষিত হওয়ার ফলে ভাবের উদ্রেক হয় এবং তা রস সৃষ্টিতে পরিণত হয়। অবশ্য বৈদিক যুগে পূজায় ভাব প্রকাশের জন্য মুদ্রার প্রচলন ছিল। সামগানে ছন্দ, তাল ও ভাবকে যথাযথ প্রকাশের জন্য মুদ্রার ব্যবহার করা হত।
    
    নাট্যশাস্ত্র এবং অভিনয় দর্পণ অনুসারে অসংযুক্ত ও সংযুক্ত মুদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে নাট্যশাস্ত্র এবং অভিনয় দর্পণের মুদ্রার সংখ্যা ও প্রয়োগে কিছু পার্থক্য আছে।
নাট্য শাস্ত্রের মতে – ২৪ টি অসংযুক্ত হস্তের উল্লেখ আছে।

পতাক
কপিত্থ
চতুর
ত্রিপতাক
কটকামুখ
ভ্রমর
কর্তরীমুখ
সূচী
হংসাস্য
অর্ধচন্দ্র
পদ্মকোশ
হংসপক্ষ
অরাল
সর্পশীর্ষ
সন্দংশ
শুকতুণ্ড
মৃগশীর্ষ
মুকুল
মুষ্টি
কাঙ্গুল
উর্ণনাভ
শিখর
অলপদ্ম
তাম্রচুড়

 চিত্র সৌজন্যেঃ internet (google, www.pinterest.com , www.colorbox.com )











ভরতনাট্যম – শৃঙ্গার রস

শৃঙ্গার রস

চিত্রঃ শৃঙ্গার তাণ্ডব
    ভরতনাট্যম অনুষ্ঠানে মূল রস শৃঙ্গার। এই নৃত্যের মধ্যে তাণ্ডব এবং লাস্য দুই ধরনের শৃঙ্গার রস নিহিত থাকে। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই অধিকার আছে তাণ্ডব নৃত্যের। তবে পরবর্তী কালে রক্ষণশীল গুরুরা ভেদাভেদ সৃষ্টি করে দেন। তাণ্ডবকে পুরুষের এবং লাস্যকে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেন। তবে এই সিদ্ধান্ত অশাস্ত্রীয়। কারণ শৃঙ্গার রস থেকে উদ্ভব বলে তাণ্ডবের প্রয়োগেও সৌকুমার্য ও লীলায়িত গতি আছে এবং এতে স্ত্রী – পুরুষের সমান অধিকার। ‘নটনাদী বাদ্যরঞ্জনম’- গ্রন্থে আমরা মোট দ্বাদশ তাণ্ডবের উল্লেখ পাই-

১। আনন্দ তাণ্ডবম (সন্ময় যতিনাট্যম)
২। সান্ধ্য তাণ্ডবম (গীত নাট্যম)
৩। ঊর্ধ্ব তাণ্ডবম (চিত্র নাট্যম)
৪। শৃঙ্গার তাণ্ডবম (ভরত নাট্যম)
৫। ত্রিপুরা তাণ্ডবম (পেরানি নাট্যম)
৬। মুনি তাণ্ডবম (লাস্য বা লয় নাট্যম)
৭। সংহার তাণ্ডবম (সিমহলা নাট্যম)
৮। উগ্র তাণ্ডবম (রাজ নাট্যম)
৯। ভূত তাণ্ডবম (পট্টসা নাট্যম)
১০। প্রলয় তাণ্ডবম (পাবই নাট্যম)
১১। ভুজঙ্গ তাণ্ডবম (পিথা তাণ্ডবম)
১২। শুদ্ধ তাণ্ডবম (পদশ্রী নাট্যম)


    নাট্য শাস্ত্রের তাণ্ডব লক্ষন অধ্যায়ে একশত আটটি করনের উল্লেখ আছে। হাত এবং পা এর পারস্পরিক সহযোগিতায় করণের রুপকে প্রকাশ দেয়। আবার কয়েকটি করন একত্রে মিলিত হয়ে অঙ্গহার সৃষ্টি করে। এই করন ও অঙ্গহার গুলি নৃত্যের সৌন্দর্যের মূল উৎস। দক্ষিন ভারতের চিদাম্বরমের নটরাজ মন্দিরে খোদিত ভরতনাট্যম নৃত্যে প্রযুক্ত একশত আটটি করণের অনুকৃতি এই নৃত্যকলার বিস্ময়কর উৎকর্ষের সাক্ষী। ভরতনাট্যম নৃত্যকলায় সাধারণত আঠাশটি অসংযুক্ত মুদ্রা ও চব্বিশটি সংযুক্ত মুদ্রার প্রয়োগ হয়ে থাকে। 

Tuesday, 15 November 2016

ভরতনাট্যম - নৃত্য-পর্যায়

নৃত্য-পর্যায়


বর্তমানে ভরতনাট্যম অনুষ্ঠান বলতে সাধারণভাবে আল্লারিপু, যতিস্বরম, শব্দম, বর্ণম, প্রভৃতি বোঝায়। কিন্তু এই ধারা গুলি বহু পরে ভরতনাট্যম নৃত্য পদ্ধতিতে সংযোজিত হয়েছে।

চিত্রঃ ভরতনাট্যম নৃত্যকলা

আল্লারিপু ভরতনাট্যম নৃত্যকলার প্রথম নৃত্য। তেলুগু শব্দ আল্লারিপু কথার অর্থ হল পুষ্পিত বা প্রস্ফুটিত হওয়া। এই পর্যায়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কে বিশুদ্ধ নৃত্যের জন্য দেহভঙ্গির সুষম সৌন্দর্যে পুষ্পিত ও প্রস্ফুটিত করা হয়। শিল্পী মাথার ওপর দুটি হাত নমস্কারের ভঙ্গীতে রেখে বোলের সাথে দৃষ্টি ও গ্রীবা কর্মের দ্বারা এই নৃত্য শুরু করেন। এটি পূর্বরঙ্গ বা বন্দনা সূচক অনুষ্ঠান। নাচের মাধ্যমে শিল্পী রঙ্গদেবতা, দর্শক, সঙ্গীত শিল্পী সকলের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।

    আল্লারিপু পরবর্তী অনুষ্ঠান হল যতিস্বরম। ইহা শোভা সম্পাদক নৃত্য প্রধান অংশ। দেহভঙ্গির সঙ্গীতে সুষম সৌন্দর্য সৃষ্টি করাই এই পর্যায়ে প্রধান লক্ষ্য। এই নৃত্য সংগঠনে সাধারণভাবে পাঁচ থেকে সাতটি জটিল যতি রাগাশ্রয়ী সরগম ও তাল সমন্বয়ে মৃদঙ্গ ও মন্দিরার সাহায্যে পরিবেশিত হয়। এতে দৃষ্টি, গ্রীবা, হস্ত ও পাদকর্ম প্রধান এবং কোন বিশেষ ভাব প্রকাশ করতে হয়না। অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পীরা সৌন্দর্য সৃষ্টির উত্তেজনায় সংযমের আবেগবৃত্ত অতিক্রম করে রঞ্জনাসৃষ্টির প্রয়াস করেন। তাতে দর্শকের স্থুলরুচি পরিতৃপ্তি করে সহজেই জনপ্রিয় হওয়া যেতে পারে, কিন্তু মনের সূক্ষ্মতর আনন্দ উপলব্ধির বিঘ্ন ঘটে। ভরতনাট্যম নৃত্যধারার এই পর্যায়ে অনুষ্ঠানের বিষয়ে এই সতর্কতা বিশেষ প্রয়োজন।

    যতিস্বরমের পর অনুষ্ঠিত হয় শব্দম। এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হল তেলুগু ভাষায় রচিত ভক্তিমূলক সঙ্গীতকে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা। সঙ্গীতের মাধ্যমে দেবতা অথবা রাজার শৌর্য, বীর্য, কীর্তি বা মহত্ত্ব বর্ণনা করা হয় এবং সঙ্গীতের শেষে অভিবন্দনা করে নৃত্যের সমাপ্তি। সংস্কৃতে এই ধরনের সঙ্গীতকে ‘যশোগীতি’ বলা হয়।

    শব্দমের পর অনুষ্ঠিত হয় বর্ণম। বর্ণম ভরতনাট্যমের সর্বাপেক্ষা জটিল ও আকর্ষণীয় পর্যায়। এতে নাচ এবং নাটকের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন দেখা যায়। ভাব, রাগ ও তালযুক্ত এই অনুষ্ঠান প্রায় একঘণ্টা ব্যাপী হয়ে থাকে। আবহ সঙ্গীত প্রণয়ের অভিব্যাক্তিতে রচিত হয়। যতি গুলি অত্যন্ত জটিল ও দ্রুত হয়ে থাকে, একে ‘থিরমনম’ বলে। এর চরণম গুলি অত্যন্ত সুন্দর হয়ে থাকে। সঙ্গীতের মধ্যে কল্যাণী, নবরত্নমালিকা প্রভৃতি অপ্রচলিত রাগের প্রয়োগ দেখা যায়। এই সঙ্গীত ভাবোচ্ছল ও ভক্তিমূলক।

    পরবর্তী অনুষ্ঠান হল পদম। বর্ণম অনুষ্ঠানের শ্রম বিনোদনের জন্য এই পর্যায়ে প্রেম গীতি মূলক পদ গুলি অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। সঙ্গীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনপ্রিয় কবি জয়দেব, পুরন্দর দাস, খেত্রায়া রচিত মধুর পদাবলী পরিবেশিত হয়।


    
   সর্বশেষ অনুষ্ঠান হল তিল্লানা। ভরতনাট্যম নৃত্যধারার ছন্দ, লাস্য, মাধুর্য ও গভীরতার সমন্বয়ে সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ এই পর্যায়ে ছন্দিত হয়। এই নৃত্যে প্রত্যেকটি যতি বিলম্বিত, মধ্য ও দ্রুত লয়ে পরিবেশিত হয়। এই পর্যায়ে শিল্পী মাঝে মাঝে ক্ষিপ্রচটুল পাদ বিন্যাসে ও বিভিন্ন মুদ্রা প্রয়োগে বিভিন্ন ভাবব্যঞ্জনা মূর্ত করেন।



Thursday, 10 November 2016

ভরতনাট্যম - নাট্টুবান – দেবদাসী

নাট্টুবান – দেবদাসী


ভরতনাট্যমের চর্চা কালে আমরা যখন ইতিহাস চর্চায় ঢুকে পড়ি তখন দেখতে পাই দুটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। নাট্টুবান ও দেবদাসী

      নৃত্য সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন নাট্টুয়াঙ্গম। নট, আভই ও আঙ্গম- এই তিনটি শব্দ নিয়ে গঠিত নাট্টুয়াঙ্গম। আর সাধারন নৃত্য শিক্ষককে বলা হতো নাট্টুবান। এই নাট্টুবানরা বংশ পরম্পরায় ছিল নাচের জগতের মানুষ। এদের পেশা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে। বিনা পারিশ্রমিকে এরা শিক্ষা দিত দেবদাসীদের। বিনিময়ে দেবদাসীদের আজীবন তাদের উপার্জনের অর্ধাংশ দিতে হতো নাট্টুবানকে। নাট্টুবানের আদেশ অমান্য বা অনুমতি ছাড়া কোন অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পারত না এই দেবদাসী।

    নাট্টুবানরা ছিলেন অত্যন্ত রক্ষণশীল। কিন্তু তাদের প্রকৃত ও যথাযথ শিক্ষাদানে উৎসাহ ছিল না। পরবর্তী কালে সমাজপতিদের চক্রান্তে এবং নাট্টুবানদের অর্থ লালসায় দেবদাসীদের পবিত্র জীবন ক্রমশ ব্যাভিচার ও কলুষতায় পর্যবসিত হতে থাকে। পিতামাতার দারিদ্র ও ধর্মান্ধতার সুযোগ নিয়ে পুরোহিত ও নাট্টুবানদের চক্রান্তে দেবদাসী প্রথমে মন্দির ও পরে গণিকালয়ে স্থান পেতে থাকে। এবং সরকার অবশেষে পাস করেন ‘দেবদাসী বিল’।


      আদিযুগ হোক বা বর্তমান প্রত্যেক যুগেই মেয়েদের স্থান পুরুষদের নীচে রাখার নিচ প্রবণতা ছাড়তে পারেনা ‘সভ্য মানুষের দল’। তাই প্রাচীনযুগের গণিকালয়ে যেমন স্থান পেতেন দেবদাসীরা, বর্তমানেও সেই ধারা অব্যাহতই আছে। পরিবর্তন হয়নি নিয়মের। তবে ভরতনাট্যম এগিয়ে গেছে নিজের গতিতে। বাধায় আটকায়নি একটুও। শুধু পরিবর্তন হয়েছে ধারার। 

Monday, 7 November 2016

ভরতনাট্যম - ইতিবৃত্ত

ইতিবৃত্ত

ভারতের নৃত্য কলার অন্যান্য ধারার মতো ভরতনাট্যম নৃত্য পদ্ধতির মূল ভাবধারাও ধর্ম ভিত্তিক ও দেব নির্ভর। দেবতাকেন্দ্রিকতা থেকে মানবকেন্দ্রিকতা এই পথ যদি অনুসরন করতে হয় তবে উত্তরনের পথ প্রদর্শক হিসাবে ভরতনাট্যমকেই অনুসরন করতে হবে। শিব তাণ্ডব থেকে উৎপত্তি এই নৃত্যের। ভারতীয় ইতিহাসের ধারা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও ছিন্নসুত্র হওয়ার দরুন ভারতের নৃত্য কলার ইতিহাস জানাও প্রায় অসম্ভব। তবে ভরতনাট্যমের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের ইতিহাসের গতিধারাকেই অনুসরন করতে হবে। জানতে হবে কোন পথের মাধ্যমে এই নৃত্যকলা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।
    
    প্রাচীনতম নাট্য শাস্ত্রকার ভরত মুনির রচনাকালের আগেও দেশে প্রচলিত ছিল বিভিন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্য পদ্ধতি যা মূলত এসেছিল প্রাচীন গ্রন্থ, স্থাপত্য ও পুরাণ অনুযায়ী। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় প্রাপ্ত নারী মূর্তি স্থাপত্য, ধ্বংসস্তুপ দেখে  গবেষণার মাধ্যমে একথা প্রমানিত যে প্রাক-বৈদিক যুগেরও আগে চর্চা ছিল নৃত্য শৈলীর। এছাড়া বহু সংগৃহীত গ্রন্থ, মূর্তি প্রভৃতি বিক্ষিপ্ত উপাদানের গবেষণা করে তবেই ভরতনাট্যমের প্রকৃত ইতিহাস রচনা সম্ভব।
    
   ভরতনাট্যমের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বড়ো উপাদান হল মন্দির ও দেবদাসী। এদের ভূমিকা এই নৃত্য কলায় সর্বাধিক। অতি প্রাচীনকাল থেকে দেবমন্দিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেবতার প্রীতির জন্য দেবদাসী-দের (দেবদাসী – দেবতাদের জন্য রক্ষিত দাসী, রাজার ভোগ বিলাসিনী নন) নৃত্য-গীত প্রদর্শনের প্রথা ছিল।এই জন্য পূর্বে এই নৃত্য ‘দাসী-আটটম’ নামে পরিচিত ছিল। চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে সংকলিত পদ্মপুরাণ থেকে জানা যায় স্বর্গে পূর্ণ কল্পলাভের উদ্দেশ্যে দেবতাকে সুন্দরী স্ত্রী উৎসর্গ করার বিধি। ভবিস্য পুরাণে সূর্যের উপাসনায় নৃত্য-গীতি কুশলা স্ত্রী লোকদের উৎসর্গ করার বিধির উল্লেখ পাওয়া যায়। শিব পুরাণে শিব মন্দির নির্মাণ ও সংরক্ষন প্রসঙ্গে অন্যান্য বিধানের সাথে দেবসেবায় নিয়োজিত নৃত্য-গীত কুশলী সুন্দরী স্ত্রীলোক, দেব মনোরঞ্জনের জন্য নিয়োজিত হতো।

    তক্ষশীলার ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত ঊর্ধ্বতাণ্ডব ভঙ্গীযুক্ত নট মূর্তি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতাব্দীর শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধ নৃত্য পদ্ধতির অস্তিত্ব প্রমান করে। প্রখ্যাত চোল রাজা প্রথম রাজরাজ- এর রাজত্বকালে (৯৮৫-১০১৪ খ্রিঃ) তাঞ্জরের মন্দিরে চারশত দেবদাসীর অবস্থিতির কথা জানা যায়। গজনির সুলতান মামুদ যখন ভারতের সোমনাথ মন্দির আক্রমন করে তখন সেখানে প্রায় পাঁচ শত দেবদাসী ছিল বলে জানা যায়।    

Sunday, 6 November 2016

ভরতনাট্যম - আদি কাণ্ড

আদি কাণ্ড



গুরু ব্রহ্মা
গুরু বিষ্ণু
গুরু দেব মহেশ্বর
গুরু সাক্ষাৎ পরা ব্রহ্ম
তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ

বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে শুরু হল নৃত্য। তবে চিত্ত অশান্ত চোল রাজের। এত সুন্দর নৃত্য, দাসীদের প্রদর্শনী, মুদ্রা, শারীরিক ভঙ্গী, অভিব্যাক্তি নিখুঁত।সুর, তাল, ছন্দের এত মিলমিশ। প্রত্যেকটি ভঙ্গিমায় এতটুকু ত্রুটি নেই। কীভাবে? জন্ম কোথায় এই নৃত্যের? কী  ইতিহাস এর? জানতে যে হবেই তাঁকে।

“তদাপূজোপহারশ্চ ভক্ষ্যভোজ্যা দিকৈস্তথা ।
পূজয়িত্বা জগন্নাথ তোয়য়েৎ গীতনৃত্যকৈঃ ।।’’ – স্কন্দপুরাণ

ভারতের মার্গ নৃত্য ধারার পূর্ণাঙ্গ রূপের শ্রেষ্ঠতম অভিব্যক্তি ভরতনাট্যম। সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, স্থাপত্য, চিত্রকলা, সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বয়ে ভরতনাট্যম সারস্বত চেতনাসমৃদ্ধ মহিমায় প্রোজ্জ্বল। ভরতনাট্যমের নামকরণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। ভাব, রাগ, তাল এই তিন রকম রস নিয়ে সৃষ্টি হয় নৃত্য। অনেকে তাই মনে করেন ভাব, রাগ ও তাল এই তিনটি শব্দের প্রথম অক্ষর নিয়েই উৎপত্তি ভরতনাট্যম নৃত্যশৈলীর। আবার অনেকে মনে করেন ভরত মুনি প্রবর্তিত নৃত্য বলেই এই নৃত্যের নাম ভরতনাট্যম। তবে কোনটি প্রকৃত কারন তা জানা আজও সম্ভব হয়নি।
    মূলত দক্ষিণ ভারতে দর্শিত এই নৃত্য সম্পর্কে আসমুদ্রহিমাচল ভারতবাসীর মনে ভ্রান্ত ধারণার ব্যাপক প্রসার দেখা যায়। নৃত্যকলা সম্পর্কে যাদের তেমন চর্চা বা ধারণা নেই তারা অনেকেই ভরতনাট্যম কে দক্ষিণ ভারতের আঞ্চলিক নৃত্য ধারা বলেই ভেবে এসেছেন। এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। প্রকৃতপক্ষে ভরতনাট্যম একটি নৃত্য মাত্র নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় নৃত্য পদ্ধতি, যা অন্যান্য মার্গ নৃত্য ধারাতেও অনুসৃত হয়ে থাকে।

    ভরতনাট্যম নিয়ে চর্চা শুধু মাত্র আজকের বা একদিনের আলোচনার বিষয় নয়। একটি নৃত্য ধারার যাত্রা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে, যখন আমাদের দেশের দাক্ষ্যিনাত্বে রাজত্ব করত চোল, চালুক্য, পল্লব বংশ। ফিরে যেতে হবে সেই সময় যখন থেকে চর্চা শুরু হয়েছে নৃত্যরত নটরাজকে নিয়ে।