Thursday, 1 December 2016

ভরতনাট্যম - সমাপ্তিকা

সমাপ্তিকা





দাসী আট্টম থেকে সাদিরাট্টম হয়ে ভারতনাট্যম-এ ঢোকার পথ ছিলনা মোটেই সহজ। এসেছে প্রচুর ঝড় ঝাপটা। তা সত্ত্বেও সব কিছুর মোকাবিলা করেও ভারতনাট্যম বজায় রেখেছে তার অস্তিত্ব। শ্রী কৃষ্ণ আয়ার , রুক্মিণী দেবী প্রমুখের প্রচেষ্টায় ভারতনাট্যম হয়ে উঠেছে জীবন্ত। এবং জায়গা পেয়েছে নৃত্যকলার সর্বকালের শীর্ষ স্থানে। আসলে ভরতনাট্যম কথাটি সঠিক নয়এটি একটি নাটক। তাই ভরতনাট্যম বলাই বাহুল্য। তবে ভরতনাট্যম ও ব্যাকরন গত ভাবে ভুল নয়।বহু সংগ্রামের এবং প্রতিকুলতাকে জয় করে ভরতনাট্যম তার পথ প্রশস্ত করেছে।   



Tuesday, 29 November 2016

ভরতনাট্যম – পোশাক, অলঙ্কার, রূপসজ্জা


পোশাক, অলঙ্কার, রূপসজ্জা


পোশাকঃ উজ্জ্বল রঙের পোশাক একজন ভরতনাট্যম শিল্পীর বৈচিত্র্য বহন করে। পূর্বে এই উজ্জ্বল স্বর্ণ বর্ণীয় শাড়ি একজন শিল্পী কে তার যোগ্যতার বিচারে প্রাপ্ত করতে হতো। সোনার কাজ করা শাড়িতে থাকতো উজ্জ্বল বর্ণের পাড়। তবে বর্তমান যুগে এর প্রভাব অনেকখানি কমে গেছে। এখন উজ্জ্বল বর্ণের শাড়িই কেবল ব্যবহার করা হয়।

গয়নাঃ ভরতনাট্যম শিল্পীগণ কমপক্ষে ১০ রকম গয়না ব্যবহার করেন। ঝুমকো, কানপাশা, হার, বাজুবন্ধ, চুড়, রত্নহার, চন্দ্রকলা, কোমরবন্ধ প্রভৃতি। মাথার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় ৩ ধরনের অলঙ্কার। ব্রোচ জাতীয় অলঙ্কার ‘চন্দ্র’ ও ‘সূর্য’ ব্যবহার করা হ্য়।এবং প্রত্যেক পায়ে ব্যবহৃত হয় ৫০ টি ঘণ্টি যুক্ত ঝুমুর যা তালের সাথে ঝঙ্কারে নৃত্য অঙ্গনকে রমণীয় নেশায় ভরে তোলে।

রূপ সজ্জাঃ শিল্পীর মুখ অত্যন্ত সুক্ষ এবং উজ্বল রঙা সজ্জা হয়ে থাকে। গভীর করে পড়া হয় কাজল, ঘন কালো চোখের পাতা, উজ্জ্বল লিপস্টিক এবং কপালে লাল সিঁদুরের টিপ।

ভরতনাট্যম – ব্রিটিশ আমলের বাধা


ব্রিটিশ আমলের বাধা


অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্দিয়া কোম্পানির আগমন ও শাসন কালে ভারতবর্ষের অধিকাংশ নৃত্যকলাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। খ্রিস্টান মিশনারির আমলে ‘দেবদাসী’ রা পরিচিত হন ‘নাচিয়ে মহিলা’ হিসাবে, যা তাদের মান-সম্মানে সরাসরি আঘাত হানে। ফলে কিছু ব্রিটিশ সমাজসেবীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘Anti-Dance Movement’ ১৮৯২ সালে।


১৯১০ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্ট হিন্দু মন্দির গুলিতে দেবদাসী প্রথা এবং ভরতনাট্যম নৃত্যকলা বন্ধ করে দেয়। তবে বিংশ শতকের শুরুর দিকে শ্রী কৃষ্ণ আইয়ার এর নেতৃত্বে এই দৃশ্যে পরিবর্তন আস্তে শুরু করে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠার সাথে সাথে ফিরে আস্তে থাকে এই প্রাচীন নৃত্যশৈলী। শিক্ষিত সম্প্রদায় এই নৃত্য কলায় দার্শনিকতা ও ধার্মিক আঙ্গিক বিচার করে পুনরায় আরম্ভ করে এই নৃত্য চর্চা। ১৯৩০ সালের শুরুর দিকে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শুরু হয় এই প্রাচীন শিক্ষার প্রচলন। তবে তার স্থানান্তর হয় মাত্র। অর্থাৎ মন্দির থেকে এই নৃত্য অনুষ্ঠিত হতো শহরের থিয়েটারে। 

Monday, 28 November 2016

ভরতনাট্যম – বর্তমান অবস্থা, শ্রী কৃষ্ণ আয়ার ও রুক্মিণী দেবী

বর্তমান অবস্থা, শ্রী কৃষ্ণ আয়ার ও রুক্মিণী দেবী

নটনাদীবাদ্যরঞ্জনম ও শিলাপ্পদিকারম এই দুটি বই থেকে আমরা ভরতনাট্যম নৃত্যধারা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পেয়ে থাকি। অনেকে মনে করেন ভরতনাট্যম অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে মাদ্রাজ ও অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিখ্যাত কবি ও সঙ্গীত স্রষ্টা ঋষি ত্যাগরাজ এর তেলুগু ভাষায় রচিত অপূর্ব সঙ্গীতের মাধ্যমে ভরতনাট্যমের নাট্যধর্মী নৃত্য রূপায়িত হতে থাকে। তাঞ্জরের মহারাজা স্বোয়াদি থিরুমল সংস্কৃত ভাষায় বিষ্ণু বন্দনা সঙ্গীত রচনা করেন।

চিত্রঃ রুক্মিণী দেবী আরুন্দেল 
তাঞ্জরের রাজ দরবারের চিন্নাইয়া, পুন্নাইয়া, শিবনন্দন ও ওয়ারিভেলু এই চার ভাই, মাদুরার শ্রী সুভারায়া আন্নাভি, কল্যাণী সুন্দরম পিল্লাই, পেরিয়াতাম্বি আন্নাভি, পুন্যস্বামি আন্নাভি প্রভৃতি আচার্য দের নাম এই নৃত্যকলায় চিরস্মরণীয়।


ভরতনাট্যমকে পুনরুজ্জীবন ও সমৃদ্ধ করার জন্য যারা আত্ম নিবেদন করেছেন তাদের মধ্যে শ্রী কৃষ্ণ আয়ার ও শ্রীমতী রুক্মিণী দেবী আরুন্দেল এর নাম প্রথমেই উল্লেখ্য। দক্ষিন ভারতে যখন নাচের বিরোধী জনমত সংগঠিত করা হচ্ছিল তখন শ্রী কৃষ্ণ আয়ার এর বিরোধিতা করেন। এবং সংবাদপত্রের সহযোগিতায় ভরতনাট্যম নৃত্যকলার পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু করেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় শ্রীমতী বালা সরস্বতী বেনারসে ‘নিখিল ভারত সঙ্গীত মহা সম্মেলনে’ ভরতনাট্যম নৃত্য প্রদর্শনের সুযোগ পান।


শ্রীমতী রুক্মিণী দেবীর নাম ভারতের নৃত্য কলার গবেষণা ও প্রসারের ইতিহাসে সর্বকালে বিশেষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করতে হবে।তিনি কেবল মাত্র একজন কুশলী শিল্পী হওয়ার প্রয়াসেই আবদ্ধ থাকেননি। তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতা ও বিধি নিষেধ তুচ্ছ করে নৃত্যকলাকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আত্ম নিয়োগ করেছেন। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কারমুক্ত বুদ্ধিগত ভাবে নৃত্যকলার চর্চা তিনিই প্রবর্তন করেন।  

ভরতনাট্যম – সঙ্গীত

সঙ্গীত

   ভরতনাট্যম নৃত্যকলার অন্যতম প্রধান অঙ্গ সঙ্গীত। সঙ্গীত অংশে একজন সুকণ্ঠ শিল্পীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আবহ সঙ্গীতে বীণা, তম্বুরা, বাঁশি, নফরি, সারাংগি, বুদবুদিকা, মৃদঙ্গম, করতাল, বেহালা, সুর শৃঙ্গার, নাগেশ্বরম ও মন্দিরা ব্যবহৃত হয়।

    সাধারনভাবে ভরতনাট্যম নৃত্যে রুবকম, জাম্বাই, এরাবম, তিরুপদ্দাই, আড়াতালাম, মিত্তিয়াম, এক্তালাম প্রভৃতি নয়টি তালের ব্যবহার হয়। তালের পাঁচটি মাত্রার নাম সাধুশ্রম (চার মাত্রা), তিশ্রম (তিন মাত্রা), মিশ্রম (সাত মাত্রা), কাণ্ডম (পাঁচ মাত্রা) ও সঙ্গিরন্ম (নয় মাত্রা)। তাল গুলি বিভিন্ন মাত্রা ও যতি সহযোগে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে।

    ভারতের সবকটি নৃত্যকলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল এই ভরতনাট্যম। মহৎ শিল্পের সবকটি গুণই এই নৃত্যে আছে। কাব্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও অভিনয় এই চারটির মিলমিশে তৈরি হয় চতুরঙ্গ। শিল্পী মানসের প্রকাশ-উন্মুক্ত রূপ ভাবনা ললিত ছন্দে ও ভাবাভিনয়ের উৎকর্ষে দর্শক মন হয়ে ওঠে সহৃদয়। কাব্য, সঙ্গীত, নৃত্যে ও ছন্দের বিশিষ্ট বিভঙ্গে লীলায়িত একটি অনন্য রূপ ভাবনা দর্শককে রসমার্গে উদ্বোধিত করে।

    এখানে শিল্পীর হস্ত মুদ্রায় স্বর্গের ফুল ফোটে, দেহ ভঙ্গির বিচিত্র সঙ্গীতে সিন্ধু তরঙ্গের হিল্লোল লীলায়িত হয়, গ্রীবা বিভঙ্গে গর্ব ও নিবেদন বিচিত্র রঙ্গে মূর্ত হয়, আঁখি পল্লবের উন্মোচন ও পাতনে প্রতিবিম্বিত হয় – প্রেম, প্রতীক্ষা ও সংশয়।   

Friday, 18 November 2016

ভরতনাট্যম – মুদ্রা

মুদ্রা

আস্যেনালম্বয়েদ গীতং হস্তেনাথং প্রদর্শয়েৎ ।
চক্ষুভাং দর্শয়েদ্ভাবং পাদাভ্যাঅং তালমাদিসেৎ ।।
যতো হস্তস্ততো দৃষ্টিষতো দৃষ্টিষতো মনঃ ।
যতো মনস্ততো ভাব যতো ভাবস্ততো রসঃ ।।

    
    অর্থাৎ, মুখের দ্বারা গান অবলম্বন করা উচিত, হস্তের দ্বারা গানের অর্থ প্রদর্শন, চক্ষু দ্বারা ভাব প্রদর্শন ও পদদ্বয়ে তাল রক্ষা করা উচিত। যেখানে হস্ত সেখানে দৃষ্টি, যেখানে দৃষ্টি সেখানেই মনের গতি, যেখানে মনের গতি সেখানেই ভাব, আর সেখানেই রসের উৎপত্তি।
    
    নৃত্যকলায় রস ও ভাব প্রকাশের জন্য প্রয়োজন হয় মুদ্রা। ‘মুদ্রং আনন্দং রাতি দাতি’ অর্থাৎ মুদ্রা বলতে বোঝায় যা আনন্দ দান করে। নৃত্যে আঙ্গিকাভিনয়ের জন্য বিভিন্ন হস্ত মুদ্রা বিভিন্ন ভাব ও রস পরিবেশন করে।
রসোৎপত্তি হলে তবেই নাচ স্বাদযুক্ত হয়। ফলত প্রতীকধর্মী মুদ্রাগুলি মানুষের আন্তঃভাব ও রসকে বাস্তবের জগতে প্রতিফলন ঘটায়। হস্ত অর্থাৎ হাতের দ্বারা সৃষ্ট মুদ্রার মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। দৃষ্টি আকর্ষিত হওয়ার ফলে মন আকৃষ্ট হয়। দৃষ্টি আকর্ষিত হওয়ার ফলে ভাবের উদ্রেক হয় এবং তা রস সৃষ্টিতে পরিণত হয়। অবশ্য বৈদিক যুগে পূজায় ভাব প্রকাশের জন্য মুদ্রার প্রচলন ছিল। সামগানে ছন্দ, তাল ও ভাবকে যথাযথ প্রকাশের জন্য মুদ্রার ব্যবহার করা হত।
    
    নাট্যশাস্ত্র এবং অভিনয় দর্পণ অনুসারে অসংযুক্ত ও সংযুক্ত মুদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে নাট্যশাস্ত্র এবং অভিনয় দর্পণের মুদ্রার সংখ্যা ও প্রয়োগে কিছু পার্থক্য আছে।
নাট্য শাস্ত্রের মতে – ২৪ টি অসংযুক্ত হস্তের উল্লেখ আছে।

পতাক
কপিত্থ
চতুর
ত্রিপতাক
কটকামুখ
ভ্রমর
কর্তরীমুখ
সূচী
হংসাস্য
অর্ধচন্দ্র
পদ্মকোশ
হংসপক্ষ
অরাল
সর্পশীর্ষ
সন্দংশ
শুকতুণ্ড
মৃগশীর্ষ
মুকুল
মুষ্টি
কাঙ্গুল
উর্ণনাভ
শিখর
অলপদ্ম
তাম্রচুড়

 চিত্র সৌজন্যেঃ internet (google, www.pinterest.com , www.colorbox.com )











ভরতনাট্যম – শৃঙ্গার রস

শৃঙ্গার রস

চিত্রঃ শৃঙ্গার তাণ্ডব
    ভরতনাট্যম অনুষ্ঠানে মূল রস শৃঙ্গার। এই নৃত্যের মধ্যে তাণ্ডব এবং লাস্য দুই ধরনের শৃঙ্গার রস নিহিত থাকে। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই অধিকার আছে তাণ্ডব নৃত্যের। তবে পরবর্তী কালে রক্ষণশীল গুরুরা ভেদাভেদ সৃষ্টি করে দেন। তাণ্ডবকে পুরুষের এবং লাস্যকে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেন। তবে এই সিদ্ধান্ত অশাস্ত্রীয়। কারণ শৃঙ্গার রস থেকে উদ্ভব বলে তাণ্ডবের প্রয়োগেও সৌকুমার্য ও লীলায়িত গতি আছে এবং এতে স্ত্রী – পুরুষের সমান অধিকার। ‘নটনাদী বাদ্যরঞ্জনম’- গ্রন্থে আমরা মোট দ্বাদশ তাণ্ডবের উল্লেখ পাই-

১। আনন্দ তাণ্ডবম (সন্ময় যতিনাট্যম)
২। সান্ধ্য তাণ্ডবম (গীত নাট্যম)
৩। ঊর্ধ্ব তাণ্ডবম (চিত্র নাট্যম)
৪। শৃঙ্গার তাণ্ডবম (ভরত নাট্যম)
৫। ত্রিপুরা তাণ্ডবম (পেরানি নাট্যম)
৬। মুনি তাণ্ডবম (লাস্য বা লয় নাট্যম)
৭। সংহার তাণ্ডবম (সিমহলা নাট্যম)
৮। উগ্র তাণ্ডবম (রাজ নাট্যম)
৯। ভূত তাণ্ডবম (পট্টসা নাট্যম)
১০। প্রলয় তাণ্ডবম (পাবই নাট্যম)
১১। ভুজঙ্গ তাণ্ডবম (পিথা তাণ্ডবম)
১২। শুদ্ধ তাণ্ডবম (পদশ্রী নাট্যম)


    নাট্য শাস্ত্রের তাণ্ডব লক্ষন অধ্যায়ে একশত আটটি করনের উল্লেখ আছে। হাত এবং পা এর পারস্পরিক সহযোগিতায় করণের রুপকে প্রকাশ দেয়। আবার কয়েকটি করন একত্রে মিলিত হয়ে অঙ্গহার সৃষ্টি করে। এই করন ও অঙ্গহার গুলি নৃত্যের সৌন্দর্যের মূল উৎস। দক্ষিন ভারতের চিদাম্বরমের নটরাজ মন্দিরে খোদিত ভরতনাট্যম নৃত্যে প্রযুক্ত একশত আটটি করণের অনুকৃতি এই নৃত্যকলার বিস্ময়কর উৎকর্ষের সাক্ষী। ভরতনাট্যম নৃত্যকলায় সাধারণত আঠাশটি অসংযুক্ত মুদ্রা ও চব্বিশটি সংযুক্ত মুদ্রার প্রয়োগ হয়ে থাকে।